শিরোনাম
নয়ন চক্রবর্তী, বান্দরবান : | ০৫:১৩ পিএম, ২০২৬-০৯-১৯
বান্দরবানের দূর্গম পাহাড়ে প্রযুক্তিনির্ভর সুপেয় পানিতে স্বস্তি ফিরেছে লক্ষাধিক মানুষের। এক কলস সুপেয় পানির জন্য কয়েক কিলো উঁচু-নিচু পাহাড়ি পথ পাড়ি দিতে হতো।সেখানে জেলা পরিষদ ও জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের বিভিন্ন প্রযুক্তিনির্ভর সুপেয় পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন প্রকল্পের মাধ্যমে এখন পাহাড়ের চূড়ায় বসবাসরতরা ঘরের কাছেই পাচ্ছেন নিরাপদ পানি।
এক সময় পানি সংগ্রহ করা ছিল পাহাড়ের মানুষের জীবনের সবচেয়ে কঠিন সংগ্রামগুলোর একটি। পাহাড়ের চূড়ায় বসবাসকারী এসব পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর হাতের কাছে ছিল না নিরাপদ পানির কোনো উৎস। খাবার পানি, রান্না, গোসল কিংবা গৃহস্থালির নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজে ব্যবহারের জন্য প্রতিদিন দুর্গম পাহাড়ি পথ বেয়ে এক থেকে তিন কিলোমিটার পর্যন্ত পথ পাড়ি দিতে হতো তাদের। কোথাও কোথাও পানি সংগ্রহের জন্য পাহাড়ি ঢাল বেয়ে নামতে হতো হাজার ফুট নিচে।সেখানে ঝিরি, ঝর্ণা কিংবা পাহাড়ি ছড়ার অনিরাপদ পানিই ছিল এসব দুর্গম জনপদে বসবাসকারী পাহাড়ি-বাঙালি মানুষের একমাত্র ভরসা। প্রতিদিনের এই পানির সংগ্রাম ছিল তাদের জীবনের এক নির্মম বাস্তবতা। যেখানে এক কলস নিরাপদ পানির জন্যও লড়াই করতে হতো দুর্গম পাহাড়ি পথ আর প্রকৃতির প্রতিকূলতার সঙ্গে।
আবার বর্ষাকালে পাহাড়ি ছড়ায় পানি থাকলেও তা থাকত মাটি, কাদা ও ময়লায় ভরা। আর শুষ্ক মৌসুম এলেই পানির সংকট হয়ে উঠত আরও ভয়াবহ। বিশেষ করে নারী ও শিশুদের দিনের বড় একটি অংশ ব্যয় হতো শুধু পানি সংগ্রহে। দুর্গম পাহাড়ি পথ বেয়ে ভারী কলসি কাঁধে পানি বহন করতে গিয়ে শারীরিক কষ্টের পাশাপাশি নিতে হতো নানা ঝুঁকিও।
বছরের পর বছর ধরে চলা সেই দুর্ভোগের চিত্র এখন বদলাতে শুরু করেছে বান্দরবানের প্রত্যন্ত পাহাড়ি জনপদে।
জেলা পরিষদ ও জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের বিভিন্ন প্রযুক্তিনির্ভর সুপেয় পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন প্রকল্পের মাধ্যমে এখন পাহাড়ের চূড়ায় বসবাসরত মানুষও ঘরের কাছেই পাচ্ছেন নিরাপদ পানি। গভীর নলকূূপ, গ্র্যাভিটি ফ্লো সিস্টেম (জিএফএস), রিংওয়েল, রেইন ওয়াটার হারভেস্টিংসহ বিভিন্ন প্রযুক্তির সমন্বয়ে দুর্গম এলাকায় গড়ে তোলা হয়েছে টেকসই পানি সরবরাহ ব্যবস্থা।
এর ফলে বান্দরবানের অন্তত ৫০টি প্রত্যন্ত পাহাড়ি পাড়ার লক্ষাধিক পিছিয়ে পড়া পাহাড়ি-বাঙালি জনগোষ্ঠীর জীবনে এসেছে স্বস্তি। দীর্ঘদিনের পানির কষ্ট ভুলে এখন তাদের মুখে ফুটেছে স্বস্তির হাসি।
সম্প্রতি সরেজমিনে বান্দরবান সদর উপজেলার কয়েকটি দুর্গম ইউনিয়নের পাহাড়ি এলাকা ঘুরে দেখা যায়, পাহাড়ের চূড়ায় বসবাসরত বিভিন্ন পাড়ার মানুষ এখন বাড়ির পাশেই স্থাপিত পানির কল থেকে সুপেয় পানি সংগ্রহের চিত্র। সেই পানি দিয়ে কেউ
রান্নার কাজ সারছেন, কেউ গোসল , কাপড় ধুচ্ছেন কিংবা গৃহস্থালির অন্যান্য কাজে ব্যবহার করছেন। কোনো কোনো এলাকায় পানির সহজলভ্যতা বাড়ায় কৃষি ও সেচ কাজেও পানি ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের ‘বিভিন্ন প্রযুক্তির মাধ্যমে সুপেয় পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন প্রকল্পের’ আওতায় দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় গভীর নলকূপ, জিএফএস, রিংওয়েল ও রেইন ওয়াটার হারভেস্টিংসহ বিভিন্ন পানি সরবরাহ ব্যবস্থায় পাল্টে দিয়েছে কষ্ট ও সংকটের চিত্র।
স্থানীয়দের ভাষায়, এটি শুধু একটি পানি প্রকল্প নয়, এটি পাহাড়ের মানুষের দীর্ঘদিনের জীবনসংগ্রামে একটি বড় পরিবর্তনের সুচনা।
জেলা শহর থেকে প্রায় চার কিলোমিটার দূরে পাহাড়ি গ্রাম টিএনটি মারমা পাড়া। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, প্রায় ৬০বছর বয়সী বৃদ্ধা মাচিং মারমা বাড়ির পাশের পানির কল থেকে গোসল ও কাপড় ধোয়া শেষে কলসিতে পানি নিয়ে ঘরে ফিরছেন। এক বছর আগেও এই দৃশ্য ছিল তাঁর কাছে কল্পনার বাইরে।
তিনি বলেন, আগে খাবার পানি, গোসল কিংবা কাপড় ধোয়ার জন্য পাড়া থেকে প্রায় ৮০০ ফুট নিচে পাহাড়ি পথে যেতে হতো। এখন বাড়ির পাশেই পানি পাচ্ছেন তিনি।
পাড়াটির অপর নারী উয়ই চিং মারমা জানান, পানি সহজলভ্য হওয়ায় সবচেয়ে বেশি পরিবর্তন এসেছে নারীদের জীবনে। আগে যে সময়ের বড় একটি অংশ পানি সংগ্রহে ব্যয় হতো, এখন সেই সময় পরিবারের অন্যান্য কাজ, সন্তানদের দেখাশোনা ও আয়মূলক কর্মকান্ডে ব্যবহার করা যাচ্ছে।
মানুচিং মারমা বলেন, ৫-৬ মাসে আগে জনস্বাস্থ্য বিভাগ থেকে একটি নলকূপ স্থাপন করা হয় তাদের পাড়ায়। সেখান থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে বাড়ির পাশে পানির কল বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। এখন ঘরে বসেই মানুষ সুপেয় খাবার পানি পাচ্ছেন।
পাড়ার কারবারি অংবাই মারমা জানান, আগে তাদের এলাকার মানুষের সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি ছিল পানি। জনস্বাস্থ্য বিভাগের স্থাপিত একটি গভীর নলকূপ ও পাইপলাইনের মাধ্যমে এই এলাকার পাহাড়ি-বাঙালি মিলিয়ে প্রায় ৮০টি পরিবারের কয়েকশ মানুষ এখন বাড়ির কাছেই সুপেয় পানির সুবিধা পাচ্ছেন।সরকার ও জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তিনি।
বান্দরবান শহরের পর্যটন মোটেল এলাকার বাসিন্দা জসিম উদ্দিন চৌধুরী ও কনক চাকমা জানান, একসময় এই এলাকার কয়েকটি পাড়ার মানুষ চরম পানি সংকটে ছিল। এখন সেই কষ্ট অনেকটাই লাঘব হয়েছে। খুব সহজেই খাবার ও ঘরের নিত্যদিনের ব্যবহারের পানি পাওয়া যাচ্ছে।
অন্যদিকে, বান্দরবান-চট্টগ্রাম প্রধান সড়কের লম্বা রাস্তা পাড়ার বাসিন্দা হামিদা বেগম, রোকসানা আকতার, বেল্লাল হোসেন, ফারুক আহমেদ ও হাসেম আহমেদ বলেন, তাদের পাড়ার প্রায় ১০টি পরিবার দীর্ঘদিন ধরে নিরাপদ খাবার পানি ও ব্যবহার্য পানির চরম সংকটে ছিল। শুষ্ক ও তীব্র গরমের মৌসুমে পানির সংকট আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করত।
তাঁরা জানান, কয়েক মাস আগে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর এলাকায় একটি রিংওয়েল স্থাপন করে দিয়েছে। এখন এই পরিবারগুলোর প্রায় ৩৫জন মানুষ সহজেই পানির সুবিধা পাচ্ছেন।
বান্দরবান জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগ সূত্রে জানা যায়, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় বিএডিসি ও ডিপিএইচই’র অর্থায়নে-‘স্যানিটেশন ব্যবস্থার উন্নয়ন ও নিরাপদ পানি সরবরাহ প্রকল্প এর মাধ্যমে ৪৫কোটি টাকা ব্যয়ে জেলা পরিষদ ও জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগের উদ্যোগে বিভিন্ন প্রযুক্তি মাধ্যমে সুপেয় পানি সরবরাহ ও সেনিটেশন প্রকল্পে ২০২৪-২৫ ও ২০২৫-২৬ অর্থ সালে বান্দরবানে ১২টি গ্র্যাভিটি ফ্লো সিস্টেম (জিএফএস) মেরামত, নতুন করে আরও ১০টি জিএফএস নির্মাণ, ৫৮৩টি রিংওয়েল নির্মাণ, ১৪০টি রেইন ওয়াটার হারভেস্টিং সিস্টেম স্থাপন, ৫০টি গভীর নলকূপ নির্মাণ, পাড়া-ভিত্তিক পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে ৫০টি প্রোডাকশন টিউবওয়েল স্থাপন করা হয়েছে। এছাড়াও স্যানিটেশন সুবিধা সম্প্রসারণে বিভিন্ন এলাকায় স্বাস্থ্যসম্মত ৩০টি টয়লেট নির্মাণ করা হয়েছে।
বান্দরবান জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের উপ-সহকারী প্রকৌশলী সাইদুল ইসলাম জানান, স্থানীয় লোকজনের আবেদনের প্রেক্ষিতে জেলার অন্তত ৫০টি পাড়ায় নিরাপদ পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে।
এবিষয়ে বান্দরবান জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী অনুপম দে বলেন, ভৌগোলিক ও প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যের কারণে বান্দরবানের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় সুপেয় পানি সরবরাহে একই ধরনের প্রযুক্তি সব জায়গায় ব্যবহার করা সম্ভব নয়। ভিন্ন ভিন্ন প্রযুক্তির ব্যবহার করতে হয়।ফলে সম্প্রতি , ৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ে জেলার দুর্গম এলাকায় পুরোনো গ্র্যাভিটি ফ্লো সিস্টেম মেরামতের পাশাপাশি নতুন জিএফএস, রিংওয়েল, রেইন ওয়াটার হারভেস্টিং সিস্টেম, গভীর নলকূপ এবং পাড়া-ভিত্তিক পানি সরবরাহ ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে সরাসরি অন্তত ৫০টি পাড়ার মানুষ সুবিধা পাচ্ছেন।
তিনি আরও বলেন, টানা বৃষ্টি ও সাম্প্রতিক বন্যার কারণে কিছু স্থাপনার প্লাস্টার ও রঙের কাজ বাকি থাকলেও প্রকল্পের মূল কার্যক্রম ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে।
খবর বিজ্ঞপ্তি : চট্টগ্রাম রেঞ্জের ১১টি জেলায় মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযান ও নিয়মিত মামলায় গত ২৪ ঘণ্টায় ৪৭৭ জনকে গ্রেফ...বিস্তারিত
আলমগীর মানিক, রাঙামাটি : একদিকে পর্যটকের ভিড়, অন্যদিকে ব্যস্ত সড়ক ও বাণিজ্যিক এলাকায় নানা ধরনের অপরাধের ঝুঁকি; এমন বাস্তবত...বিস্তারিত
আলমগীর মানিক, রাঙামাটি : রাঙামাটিতে মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযানে মাদক কারবারি ও সেবনকারীসহ ১৮ জনকে গ্রেপ্তার করেছে কোতয়ালী থ...বিস্তারিত
নিজস্ব প্রতিবেদক : দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে ভূমিকা এবং দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধকরণে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ চট্...বিস্তারিত
স্টাফ রিপোর্টার : : কে. এম. আলী হাসান চট্টগ্রামে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার নামে চলছে নানা অনিয়ম ও লুটপাট—এমন অভিযোগ উঠ...বিস্তারিত
বান্দরবান প্রতিনিধি : : বান্দরবানের রুমা উপজেলা পল্লী উন্নয়ন বোর্ডের একজন মাঠ সংগঠক সমিতির ঋণ আদায় করতে গিয়ে নিখোঁজ হয়েছ...বিস্তারিত
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৯ - © 2026 Dainik amader Chattagram | Developed By Muktodhara Technology Limited